জাপানের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা, কার বিরুদ্ধে

0
40

অনেক দিন থেকেই যেন এক ছায়া-শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে জাপান। আর এই লড়াইয়ে প্রতিবছর জাপানের জন্য বেড়ে চলেছে প্রতিরক্ষা ব্যয়। জাপান সরকার আজ সোমবার আগামী এপ্রিল মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া ২০২১ অর্থবছরের প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছে। এতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৩৪ লাখ কোটি ইয়েন, ডলারের হিসাবে যা হচ্ছে ৫ হাজার ১৬০ কোটি ডলার। ২০২০ অর্থবছরের চেয়ে এটি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এবার নিয়ে টানা সাত বছর জাপানের প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ রেকর্ড পরিমাণে বাড়ল।

অতীতে শত্রুকে নিয়ে কিছুটা রাখঢাক লক্ষ করা গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিন্তু ইনিয়ে–বিনিয়ে হলেও শত্রুটা কে, তার নাম অনেকটা প্রকাশ্যেই বলা হচ্ছে। জাপানের এই শত্রু হচ্ছে চীন। মন্ত্রিসভা খসড়া প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদনের পর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নোবুও কিশি বলেছেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে কয়েকটি দ্বীপের মালিকানার প্রশ্নে চীনের ক্রমবর্ধমান সমুদ্র তৎপরতার জবাব জাপানের দেওয়া প্রয়োজন। ফলে নতুন যুদ্ধ সরঞ্জাম সংগ্রহে বাজেটের বড় এক অংশ ব্যয় করা হবে।

সেনকাকু দ্বীপমালা ঘিরে জাপান ও চীনের সম্পর্ক ক্রমশ জটিল আকার নিতে শুরু করেছে। পূর্ব চীন সাগরের জনবসতিহীন সেই দ্বীপগুলো জাপানের নিয়ন্ত্রণে আছে এবং জাপান সেগুলোকে দেশের সার্বভৌমত্বের অংশ হিসেবে উল্লেখ করছে। জাপান বলছে, এই প্রশ্নে অন্য কারও সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ সামনে নেই। অন্যদিকে চীন সেই যুক্তি মেনে নিতে নারাজ এবং বেইজিং দাবি করছে যে সেসব দ্বীপ চীনের অংশ। ফলে মানব বসতিহীন দ্বীপগুলোর চারপাশে চলছে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা। চীন সেখানে নিজেদের জাহাজ পাঠালে জাপানও পিছিয়ে থাকছে না। আর এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমগ্র পূর্ব এশিয়ায় চলছে বিরামহীন এক অস্ত্র প্রতিযোগিতা, অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের তহবিলের ওপর যেটা চাপ প্রয়োগ করছে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শত্রুর ঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম দেশে তৈরি নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য ৩ হাজার ৩৫০ কোটি ইয়েন বরাদ্দ নিশ্চিত করে নিয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁরা বলছেন, জাপানের শান্তির সংবিধান ও প্রতিরক্ষাকেন্দ্রিক নীতিমালার লঙ্ঘন হিসেবে এটাকে দেখা হতে পারে। সরকার অবশ্য সেই যুক্তি মেনে নিতে নারাজ। ৯০০ কিলোমিটার দূরত্বে উড়ে যেতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে এবং সরকারের ধারণা, দেশের সামরিক সক্ষমতা এটি বাড়িয়ে দেবে, আগ্রাসী সামর্থ্য নয়।

এ ছাড়া ইজিস ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংযুক্ত নতুন দুটি রণতরি নির্মাণের প্রস্তুতি গ্রহণে ১৭০ কোটি ইয়েন বরাদ্দ বাজেটে রাখা হয়েছে। এর আগে কথা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ইজিস ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জাপানে বসিয়ে দেবে। এ জন্য দেশের উত্তরাঞ্চলে একটি জায়গাও ঠিক করে নেওয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয় অধিবাসীদের আপত্তির মুখে এবং ব্যয় ক্রমশ বেড়ে চলায় সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী তারো কোনো গত বছর সেই পরিকল্পনা বাতিল করে দেন। জাপানের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সেই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। আর তাই বিকল্প কিছু একটা করার জন্য চাপের মুখে ছিল জাপান এবং সম্ভাব্য একটি বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার জন্য জাপানকে বলা হয়েছিল। ফলে রণতরিতে ইজিস ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। জাপানের যুদ্ধজাহাজের বহরে ইতিমধ্যে সে রকম ডেস্ট্রয়ার আছে। এখন নতুন ইজিস ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য আরও দুটি রণতরি জাপান বানিয়ে নেবে এবং সেই বরাদ্দ ২০২১ অর্থবছরের বাজেটের খসড়ায় রাখা হয়েছে।

সনাতন প্রতিরক্ষা খাতের বাইরে বিগত কয়েক বছরে নতুন যে আরেকটি দিকে জাপানকে অর্থ খরচ করতে দেখা যাচ্ছে, সেই খাত হলো মহাকাশ গবেষণা। অগ্রসর অনেক দেশই এখন আগামীর যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে মহাকাশ গবেষণায় মনোনিবেশ করছে। ২০২১ অর্থবছরের খসড়া বাজেট প্রস্তাবে জাপান এই খাতের জন্য ১১ হাজার ৯১০ কোটি ইয়েন বরাদ্দ রাখতে চাইছে। হাইপারসনিক অস্ত্র শনাক্ত করার জন্য মহাশূন্যে অজানা বস্তু, উপগ্রহ সমাবেশের ওপর নজর রাখার গবেষণাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজে এই অর্থ খরচ করা হবে। ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে দ্রুতগতিতে ও নিচু দিয়ে উড়ে যেতে সক্ষম এ রকম অস্ত্র রাশিয়া ও চীন তৈরি করছে।

বিগত বছরগুলোতে জাপান প্রতিরক্ষা বাজেট প্রণয়নে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের জবাব দেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চীন ক্রমশ উত্তর কোরিয়ার সেই উদ্বেগের জায়গাটির দখল নিতে শুরু করেছে। উত্তর কোরিয়ার প্রসঙ্গ এখনো আলোচিত। তবে মুখে না বলা হলেও এক নম্বর শত্রুর জায়গাটি ক্রমশ চীনের দখলে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে চীনও বসে নেই প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে নেওয়া থেকে। একই প্রবণতা দৃশ্যমান উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও আসিয়ানের বেশ কয়েকটি দেশে। ফলে উচ্চকণ্ঠে বলা না হলেও অস্ত্র প্রতিযোগিতা এখন এশিয়া মহাদেশজুড়েই ব্যাপকভাবে চলমান।